আমরা কি প্রযুক্তির উপর এতটাই নির্ভরশীল!

May 8, 2018 ...

পুরোটা পড়ার সময় নেই? ব্লগটি একবারে শুনে নাও!

 

কিছুদিন আগে আমার এক শিক্ষক আমাদের একটি ঘটনা বলছিলেন। তাঁর এক বন্ধু বিদেশ থেকে আসা উপলক্ষ্যে সব বন্ধুদের একসাথে খাওয়ার পরিকল্পনা করা হলো। সেখানে সবাই এসেছে ঠিকই, কিন্তু সবাই ব্যস্ত ছিল তাদের হাতের সেই ছোট যন্ত্রটিকে নিয়েই।

প্রযুক্তি ও তথ্যপ্রবাহের এই যুগে আমরা জীবনকে সহজ করে ফেলেছি ঠিকই, কিন্তু কোথায় যেন সেই জীবনকেই হারিয়ে ফেলেছি। আমাদের এখন দিন শুরু হয় যন্ত্রের শব্দে এবং শেষও হয় তার হাত ধরেই। আমরা প্রযুক্তির উপর এতটাই নির্ভরশীল হয়ে পড়েছি যে এটি ছাড়া আমাদের অস্তিত্বই কল্পনা করা যায় না।

কাউকে “কেমন আছ” জিজ্ঞেস করার চেয়ে বেশি পছন্দ করি তার স্ট্যাটাস দেখে সে উত্তর খুঁজে নেয়া। সামনের বন্ধুদের যতটা না সময় দেই, তার চেয়ে বেশি দেই ভার্চুয়াল বন্ধুদের। সামান্য যোগ বিয়োগ করতেও সাহায্য নেই মোবাইল ফোনের। যেই লেখাটি পড়ছ, সেটিও কিন্তু সম্ভব হয়েছে এই প্রযুক্তির কারণেই। তবে প্রযুক্তির উপর এতটাই নির্ভর হয়ে যাওয়া কি ঠিক?

১। বিনোদনে ভিন্নতা:

এখন আমাদের বিনোদনের জগৎ ঐ ছোট স্ক্রীনেই সীমাবদ্ধ। মোবাইল ফোন কিংবা ল্যাপটপেই  যদি ক্রিকেট খেলা যায় তবে কেই বা চাইবে কষ্ট করে বাইরে বের হতে? এখন খেলা মানেই আমরা ভিডিও গেমসকে বুঝি । খেলার মাঠে যেয়ে খেলা এখন অনেকের কাছেই গ্রাম্য ব্যপার হয়ে গিয়েছে।

বিনোদনের ধরনও সাথে সাথে পালটে গেছে। সারাদিনের কাজ শেষে ল্যপটপে বসে সিনেমা দেখাকে, অবসর সময়ে স্ক্রীনের দিকে তাকিয়ে বই পড়াকে বলি বিনোদন। এসব বিনোদন ঠিকই তবে সারাদিনের কাজের শেষে প্রিয়জনদের সময় দেয়া কিংবা নতুন বইয়ের পৃষ্ঠা উলটানোর আনন্দ সেখানে পাওয়া যায় না। খেলার মাঠে প্রতিদিন নতুন মানুষের সাথে পরিচিত হওয়া, টিম ওয়ার্ক, শারীরিক গঠন এসব ভার্চুয়াল গেমসে কখনোই সম্ভব নয়।  

1 11

২। সামাজিক জীবন:

সামাজিক জীবনের সংজ্ঞাই এখন পুরোপুরি বদলে গিয়েছে। সামাজিক জীবন বলতে এখন আমরা বুঝি সোশ্যাল মিডিয়ায় কে কতটা সক্রিয়। সামজিক জীবন ফেসবুকের ফ্রেন্ডলিস্টের মধ্যেই সীমাবদ্ধ। এখন আমরা পাশে বসে থাকা মানুষের সাথে কথা বলার চেয়ে ভার্চুয়ালি কথা বলতে বেশি স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করি।    

৩। যোগাযোগ:

শেষ কবে তুমি তোমার বন্ধুর সাথে ফোনে কথা বলেছ? এখন যোগাযোগের মাধ্যম হিসেবে আমরা চ্যাটিং কিংবা টেক্সটিংকেই বেছে নেই। যোগাযোগ সেখানে ঠিকই হয়, তবে অনেক সময় যা বলতে চাওয়া হচ্ছে তা সেখানে প্রকাশ পায় না। কাজের ক্ষেত্রেও অনেক সময় নির্দেশনা ভুল বুঝার ফলে কাজটি সঠিকভাবে সম্পন্ন হয় না।

৪। সৃজনশীলতার অভাব:

কোন কিছুর উত্তর পেতে এখন আমরা বিন্দুমাত্র সময় নষ্ট না করে গুগলে সার্চ করি। সেখানে উত্তর ঠিকই পাই, তবে সেটা আমাদের উপলব্ধি থেকে আসা উত্তর নয়, বরং সেটা অন্য কারও। এখানে আমাদের কোন চিন্তা ভাবনারই প্রয়োজন পড়ে না।

কোন কিছু শিখতেও আমরা শুধুমাত্র ইন্টারনেটের উপরই নির্ভরশীল তবে সেখান থেকে নতুন কিছুর সৃষ্টি কী করে সম্ভব? যেমন, কোন কিছু তৈরি করতে আমরা ইউটিউবের ভিডিও কিংবা নির্দেশনাবলি হুবহু অনুকরণ করি। সেখানে সেই জিনিসটি তৈরি ঠিকই হয়, তবে নতুন কিছু নয়। নিজের চিন্তাকে বাস্তবায়ন করতে গিয়ে নতুন কোন আবিষ্কার হলেও হতে পারে।  

৫। বর্তমানকে হারানো:

এখন সবাই নিজের ভালো থাকার চেয়ে সেটি অন্যকে বুঝাতে বেশি আগ্রহ প্রকাশ করে। নতুন কোথাও ঘুরতে গেলে নিজের চোখে দেখার আগে সেটিকে ক্যামেরাবন্দি করতে ব্যস্ত হয়ে পড়ে, এভাবে নিজের বর্তমানকেই অনেকে অনুভব করতে পারে না। অনেক সময় পরিবারকে সময় দেয়ার পরিবর্তে ফেসবুকে বসে থাকাকেই অভ্যাসে পরিণত করে ফেলে অনেকে। সেই সময় হয়ত আর কখনো ফিরে নাও আসতে পারে। 

সমস্যা প্রযুক্তিতে নয় সমস্যা সেগুলোর ব্যবহারে। আমরা প্রযুক্তিকে বর্তমান থেকে মুক্তির পথ হিসেবে বেছে না নিয়ে, তাকে শুধু একটি টুল হিসেবে ব্যবহার করলেই প্রযুক্তির উপর অতিরিক্ত নির্ভরশীলতা থেকেও পাবো মুক্তি।

এই লেখাটির অডিওবুকটি পড়েছে মনিরা আক্তার লাবনী।


১০ মিনিট স্কুলের লাইভ এডমিশন কোচিং ক্লাসগুলো অনুসরণ করতে সরাসরি চলে যেতে পারো এই লিঙ্কে: www.10minuteschool.com/admissions/live/

১০ মিনিট স্কুলের ব্লগের জন্য কোনো লেখা পাঠাতে চাইলে, সরাসরি তোমার লেখাটি ই-মেইল কর এই ঠিকানায়: write@10minuteschool.com

আপনার কমেন্ট লিখুন