অর্থনীতিতে নোবেল পেলেন যাঁরা

January 23, 2019 ...
পুরোটা পড়ার সময় নেই? ব্লগটি একবার শুনে নাও।

পুরো পৃথিবীতে এখন পর্যন্ত যতগুলো পুরস্কার এর প্রচলন করা হয়েছে সেগুলোর মাঝে সবচেয়ে সম্মানজনক পুরস্কার হচ্ছে নোবেল পুরস্কার। সারা পৃথিবীর বিভিন্ন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানকে সফল এবং অনন্য সাধারণ গবেষণা ওউদ্ভাবন এবং মানবকল্যাণমূলক কর্মকাণ্ডের জন্য নোবেল পুরস্কার প্রদান করা হয়। তবে সেসব গবেষণা, উদ্ভাবন কিংবা মানবকল্যাণমূলক কর্মকাণ্ড হতে হবে নির্দিষ্ট কিছু ক্ষেত্রে। সেগুলো হচ্ছে – পদার্থবিজ্ঞান, রসায়ন, চিকিৎসা, সাহিত্য, শান্তি এবং অর্থনীতি। নোবেল পুরস্কারপ্রাপ্তদেরকে নোবেল লরিয়েট বলা হয়।

bPOcCKUSjar tTasatJuUcLVD6IWl13h6jZQEO0Ldqs3a84B4gt8zQ5eeWQNn8iiy0dH62w SkUkGRfMd0s0VoBdVNwv85 tFIVj3Usfr3b2gtoLlkfMiWBjWd0AH O5BDLKWIWu

[Nobel Prize Medal for Physiology or Medicine]

আলফ্রেড নোবেল এর হাত ধরে আসা এই নোবেল পুরস্কার এবং অর্থনীতিতে নোবেল পুরস্কার নিয়ে জানতে হলে পড়তে হবে এই লেখাটি।

গ্রাফিক্স ডিজাইনিং, পাওয়ারপয়েন্ট প্রেজেন্টেশান ইত্যাদি স্কিল ডেভেলপমেন্টের জন্য 10 Minute School Skill Development Lab নামে ১০ মিনিট স্কুলের রয়েছে একটি ফেইসবুক গ্রুপ। গ্রুপে জয়েন করুন!

নোবেল পুরস্কারের ইতিহাসঃ

নোবেল পুরস্কার এর সৃষ্টি যার কারণে তিনি হচ্ছেন আলফ্রেড নোবেল। সুইডেনে জন্ম নেয়া নোবেল ছিলেন একাধারে রসায়নবিদ, প্রকৌশলী, উদ্ভাবক এবং উদ্যোক্তা। জীবদ্দশায় বিভিন্ন দেশে তাঁর নামে ৩৫৫টি উদ্ভাবন ছিল। তিনিই প্রথম ব্যালিস্টিক উদ্ভাবন করেন যা এখনও ধোঁয়াবিহীন সামরিক বিস্ফোরক হিসেবে ব্যবহার করা হয়।

আলফ্রেড নোবেল এর উদ্ভাবনগুলোর মাঝে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য ছিল ডিনামাইট আবিষ্কার। সেই সময় নানা কারণে পাহাড় কেটে ফেলার দরকার হতো। কিন্তু উন্নত যন্ত্রপাতি না থাকায় শ্রমিকদের দিয়ে পাহাড় কাটানো ছিল একইসাথে কঠিন, সময়সাপেক্ষ এবং বিপজ্জনক। যে কারণে আলফ্রেড নোবেল আবিষ্কার করেন ডিনামাইট যা পাহাড় কাটার কাজকে অত্যন্ত সহজ করে দেয়।

ডিনামাইটকে আলফ্রেড নোবেল মহৎ উদ্দেশ্যে আবিষ্কার করলেও পরবর্তীতে এই ডিনামাইট এর কারণে সংকটের সৃষ্টি হয়ে যায়। আলফ্রেড নোবেল তাঁর উদ্ভাবনগুলোর পেটেন্ট খুব কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করতেন। বেশ কিছু জায়গায় তাঁর উদ্ভাবিত ডিনামাইট এর পেটেন্ট নকল করে উৎপাদন করা তিনি বন্ধও করে দেন। তা সত্ত্বেও কিছু অসাধু লোক ডিনামাইট এর পেটেন্টে পরিবর্তন এনে তা উৎপন্ন করে যুদ্ধক্ষেত্রে ব্যবহার করে। এতে যে পরিমাণ মানুষ মারা যায় তা দেখে আলফ্রেড নোবেল শঙ্কিত হয়ে পড়েন।

আলফ্রেড নোবেল মৃতদের তালিকা দেখে বিস্মিত হয়ে যান এবং উপলব্ধি করেন যে, তিনি ইতিহাসে খুব বাজেভাবে স্মরণীয় হতে যাচ্ছেন। এজন্য জীবদ্দশায় অনেকগুলো উইল করলেও মৃত্যুর এক বছর আগে ১৮৯৫ সালে তাঁর করা সর্বশেষ উইল এর প্রেক্ষিতেই পরবর্তীতে আসে আজকের এই নোবেল পুরস্কার। নোবেল তাঁর উদ্ভাবনগুলো দিয়ে এবং বিশেষ করে ডিনামাইট দিয়ে প্রচুর ধন-সম্পদের মালিক হন। আলফ্রেড নোবেল তাঁর মোট সম্পত্তির ৯৪ শতাংশ উইল করে দান করে যান নোবেল পুরস্কার এর জন্য। উইল এ তাঁর বলে যাওয়ার প্রেক্ষিতেই প্রতি বছর চমৎকার সব ব্যক্তিত্বদের পুরস্কার দেওয়ার ব্যবস্থা চালু করা হয়।

nLV7 bE 3bqgxAR

[Page one of the will of Alfred Bernhard Nobel that he signed in Paris, France, November 27, 1895.]
YFA7znt6qJk6kamMkqnAe2rtz4V OU wXJl2X8XgQKxdWe89wbr w9FoW2Ym70DuqlSfDonaVHCkqi5sWZmSpuCaeOgYuxukYU cYYhv2oBfKmUoc9E5YIIfmGshp6Pbs6RsARLR

 [The section of Alfred Bernhard Nobel’s will that established the Nobel Prizes.]

নোবেল পুরস্কারের অর্থঃ

আলফ্রেড নোবেল এর শেষ উইল এ তাঁর সম্পত্তির অংশ একটি বিশেষ ফান্ড এ রেখে সেখান থেকে সম্পত্তির বর্ধিত অংশ প্রতি বছর নোবেল পুরস্কার হিসেবে দিয়ে দেওয়ার কথা বলা হয়। তিনি আরও উল্লেখ করে যান, নোবেল পুরস্কারটি দেওয়ার দায়িত্ব যেন চারটি প্রতিষ্ঠান পালন করে। এগুলো হচ্ছে – রয়েল সুইডিশ একাডেমি অফ সায়েন্সেস, ক্যারোলিন্সকা ইন্সটিটিউট, সুইডিশ একাডেমি এবং নরওয়েজীয় নোবেল কমিটি।

নোবেল পুরস্কারের বর্তমান অর্থমূল্য হচ্ছে প্রায় ৯ মিলিয়ন সুইডিশ ক্রোনর। একজনের বেশি লরিয়েট যদি নোবেল পুরস্কার পেয়ে থাকেন তবে তাঁদেরকে নোবেল পুরস্কারের অর্থ ভাগ করে নিতে হবে। তবে একই ক্ষেত্রে তিনজনের বেশি নোবেল পুরস্কার জিততে পারবেন না।

কথায় বলে, MUN is fun!

অর্থনীতিতে নোবেলঃ

আলফ্রেড নোবেল যখন উইল করে যান তখন তিনি কেবল পাঁচটি বিষয়ে নোবেল পুরস্কার দেওয়ার কথা উল্লেখ করেন। সেখানে তিনি অর্থনীতিতে নোবেল পুরস্কার নিয়ে কিছু বলেননি। ১৯৬৮ সালে সুইডিশ কেন্দ্রীয় ব্যাংক তার ৩০০ বছর পূর্তিতে নোবেল ফাউন্ডেশনকে একটি বিরাট অঙ্কের অর্থ দান করে। এই অর্থ দিয়ে আলফ্রেড নোবেল এর সম্মান রক্ষার্থে একটি নতুন পুরস্কার প্রদান করা হবে বলে ঠিক করা হয়।

যেহেতু আলফ্রেড নোবেল অর্থনীতিতে নোবেল পুরস্কারের কথা বলে যাননি এবং তাঁর সম্মান রক্ষার্থে এই পুরস্কারের প্রচলন করা হয়েছে, সেজন্য অর্থনীতিতে নোবেল পুরস্কারের বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন নাম ব্যবহার করা হয়েছে। তবে সর্বশেষ ২০০৬ সাল থেকে এটিকে “The Sveriges Riksbank Prize in Economic Sciences in Memory of Alfred Nobel” বলা হয়ে থাকে।

qjjNjlp9pna3MCUXL6SkGVJiBZTgdPIgvpVGF5btElpxqGhJP5cG nlnC9O RrYLsTLTwKgCrMTMisbcQqdQVZFmF5dwSBkVBYrxUbG FmGH33k1bujgRxFrelb4AW Swua nu4

[The obverse and reverse side of the Nobel Prize medal for Economics.]

অর্থনীতিতে নোবেল পুরস্কারের মেডেলটির উল্টো পাশের অংশে তারকাখচিত রয়েল সুইডিশ একাডেমি অফ সায়েন্সেস এর প্রতীক দেওয়া আছে। মেডেল এর উল্টো পাশের কিনারা দিয়ে যে লেখাটি (Kungliga Vetenskaps Akademien) আছে সেটি দিয়ে রয়েল সুইডিশ একাডেমি অফ সায়েন্সেসকে বোঝানো হয়।

মেডেলটির সোজা অংশে যে মুখটি দেখা যাচ্ছে তা আলফ্রেড নোবেল এর। কিন্তু অন্যান্য বিষয়ের নোবেল পুরস্কার থেকে অর্থনীতিতে নোবেল পুরস্কার আলাদা হওয়ায় এটির মেডেলে আলফ্রেড নোবেল এর মুখের ছবির অংশটি আলাদা। উপরের কিনারায় লেখা আছে –

      Sveriges Riksbank till Alfred Nobels Minne 1968

(The Sveriges Riksbank, in memory of Alfred Nobel, 1968)

নিচের শিং এর মত অংশটি ব্যাংক এর প্রাচুর্যতার প্রতীক বোঝায়। এই অংশটি অর্থনীতিতে নোবেল পুরস্কারের মেডেলকে বাকি পাঁচটি বিষয়ের নোবেল পুরস্কারের মেডেল থেকে আলাদা করে।

১৯৬৯ সালে প্রথমবারের মত অর্থনীতিতে নোবেল পুরস্কার প্রদান করা হয়। তখন থেকে অর্থনীতিতে নোবেল পুরস্কার দেওয়া হচ্ছে। জ্যান টিনবারগেন ও র‍্যাগনার ফ্রিস প্রথম অর্থনীতিতে নোবেল পুরস্কার পান অর্থনৈতিক পদ্ধতিসমুহে গতি তত্ত্ব প্রয়োগ ও উন্নতি করার জন্য।

আবার প্রথম বাঙালি হিসেবে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার পাওয়ার পর দ্বিতীয় বাঙালি হিসেবে আমাদের পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতের নাগরিক অমর্ত্য সেন দুর্ভিক্ষ, মানব উন্নয়ন তত্ত্ব, জনকল্যাণ অর্থনীতি ও গণদারিদ্রের অন্তর্নিহিত কার্যকারণ বিষয়ে গবেষণা এবং উদারনৈতিক রাজনীতিতে অবদান রাখার জন্য ১৯৯৮ সালে অর্থনীতিতে নোবেল পুরস্কার পান। আবার তৃতীয় বাঙালি হিসেবে আমাদের দেশের গর্ব অর্থনীতিবিদ ড. মুহাম্মদ ইউনূস শান্তিতে নোবেল পুরস্কার পেয়েছেন।

অর্থনীতির প্রতিটি স্তরেই কাজ করে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখে বিশেষ ব্যক্তিত্বরা পাচ্ছেন অর্থনীতিতে নোবেল পুরস্কার। তাঁদের মাঝের একজন হলেন এলিনর অস্ট্রম যিনি অর্থনীতিতে প্রথম নোবেলজয়ী নারী। অর্থনৈতিক বিশ্লেষণ সামাজিক সংস্থার বেশিরভাগ কাঠামো বিষয়ে ধারণা দিতে পারে, আলোকপাত করতে পারে – এই বিষয়টি নিয়ে গবেষণা করে সেটি সম্পর্কে আলোকপাত করে ২০০৯ সালে এলিনর অস্ট্রম অর্থনীতিতে নোবেল জয় করেছেন।

আবার মার্কিন অর্থনীতিবিদ রিচার্ড থেয়লার আচরণগত অর্থনীতিতে বিশেষ অবদান রাখেন। অর্থনীতি ও ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত গ্রহণের মনস্তাত্বিক বিশ্লেষণে সার্বিক অবদান রাখার স্বীকৃতি হিসেবে তিনি ২০১৭ সালে অর্থনীতিতে নোবেল পুরস্কার পান।

সর্বশেষ ২০১৮ সালে অর্থনীতিতে নোবেল পুরস্কার লাভ করেন দুইজন মার্কিন অর্থনীতিবিদ উইলিয়াম নর্ডহাউজ এবং পল রোমার। জলবায়ু এবং প্রযুক্তির উন্নয়নের সাথে সাথে কীভাবে দীর্ঘমেয়াদি এবং স্থিতিশীল অর্থনৈতিক উন্নয়ন করা যায় তাঁর গবেষণা করে এই দুইজন অর্থনীতিতে নোবেল পুরস্কার পান।

শেষের কথাঃ

LzWK98w1Urdddz1chEa2Q8eHFCRXOxZuoV5j90N7pt6WMxMXnH 7RwEwZutREOv5vG0skKHeksq8kLjukA8XOUvUTEw8R4 cJOfe8hCmFg9Me4RID21Fx C tHa9sCRDpM6SbniV

নোবেল পুরস্কার প্রচলন করার পেছনে আলফ্রেড নোবেল এর মানবজাতির বৃহৎ স্বার্থের উদ্দেশ্য কাজ করেছিল। সেজন্যে তিনি তাঁর সারাজীবনের কষ্টার্জিত সমস্ত সম্পদ দান করে দিয়েছিলেন এই নোবেল পুরস্কারের জন্য। আলফ্রেড নোবেল এর মৃত্যুদিবসকে স্মরণ করে প্রতি বছর ১০ ডিসেম্বর নোবেল দিবস পালন করা হয় এবং এই দিনেই নোবেল পুরস্কার দিয়ে মানবজাতির বৃহত্তর স্বার্থের উন্নতি করার জন্যে উদ্বুদ্ধ করা হয় হাজার হাজার মানুষকে।

অর্থনীতিতে নোবেল পেলেন যারা

Images collected from: https://www.britannica.com/topic/Nobel-Prize

তথ্যসূত্রঃ

https://www.nobelprize.org/

https://www.livescience.com/16365-nobel-prize-economics-list.html


১০ মিনিট স্কুলের ব্লগের জন্য কোনো লেখা পাঠাতে চাইলে, সরাসরি তোমার লেখাটি ই-মেইল কর এই ঠিকানায়: write@10minuteschool.com

আপনার কমেন্ট লিখুন